প্রবন্ধ রচনা : ঈশ্বরকে যদি গুটিকয়েক প্রশ্ন করার সুযোগ পেতাম
| Article Stats | 📡 Page Views |
|---|---|
|
Reading Effort 892 words | 5 mins to read |
Total View 3 |
|
Last Updated 11 hours ago |
Today View 0 |
↬ ঈশ্বরকে যদি গুটিকয়েক প্রশ্ন করার সুযোগ থাকলে কি প্রশ্ন করতে?
ভূমিকা :
অনাদিকাল থেকে মানুষের মনে সবচেয়ে বড় কৌতূহল এবং রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু হলেন ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তা। মানুষ যখনই নিজের অস্তিত্ব, এই বিশাল মহাবিশ্ব এবং জীবনের অর্থ নিয়ে ভাবতে বসেছে, তখনই তার চিন্তার শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে এক অসীম সত্তা। ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান—সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে সেই পরম সত্তার অস্তিত্ব বা অনস্তিত্বের প্রশ্নের চারপাশে আবর্তিত হয়েছে। মানুষ হিসেবে আমার মনেও ঈশ্বরকে নিয়ে হাজারো প্রশ্নের আনাগোনা। যদি কখনো এমন কোনো অতিপ্রাকৃত বা অলৌকিক মুহূর্ত আসে, যেখানে স্বয়ং ঈশ্বরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গুটিকয়েক প্রশ্ন করার সুযোগ মেলে, তবে সেই মুহূর্তটি হবে জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং ভীতিকর অভিজ্ঞতা। আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক হয়তো তাঁর অসীম জ্ঞান ধারণ করতে পারবে না, তবুও মানবীয় কৌতূহল থেকে আমি তাঁকে কিছু মৌলিক এবং চিরন্তন প্রশ্ন করতে চাইব। নিচে সেই প্রশ্নগুলো এবং তার পেছনের ভাবনাগুলো তুলে ধরা হলো।প্রথম প্রশ্ন: পৃথিবীতে এত দুঃখ, কষ্ট ও বৈষম্য কেন?
ঈশ্বরের কাছে আমার প্রথম এবং সবচেয়ে আবেগপূর্ণ প্রশ্নটি হবে পৃথিবীর দুঃখ-কষ্ট নিয়ে। ধর্মগ্রন্থগুলো ঈশ্বরকে পরম দয়ালু, করুণাময় এবং সর্বশক্তিমান হিসেবে বর্ণনা করে। কিন্তু আমরা যখন আমাদের চারপাশে তাকাই, তখন দেখতে পাই অবর্ণনীয় দুঃখ, কষ্ট, মহামারী, যুদ্ধ এবং বৈষম্য।
নিষ্পাপের কষ্ট: কেন একটি নিষ্পাপ শিশু দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগে মারা যায়?
প্রাকৃতিক দুর্যোগ: কেন ভূমিকম্প বা জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে হাজার হাজার নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটে?
অসমতা: কেন কেউ সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মায়, আর কাউকে একবেলা খাবারের জন্য প্রচণ্ড রোদ বা বৃষ্টির মাঝে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করতে হয়?
ঈশ্বর যদি সর্বশক্তিমান এবং পরম দয়ালুই হন, তবে তিনি কেন এই অসীম ক্ষমতার প্রয়োগ করে পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ-কষ্ট দূর করে দেন না? এটি কি তাঁর কোনো বিশাল পরিকল্পনার অংশ, নাকি মানুষের কর্মফল? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আমাকে মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার জায়গাগুলো মেনে নিতে সাহায্য করবে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য কী?
বিজ্ঞান আমাদের বলে, এই মহাবিশ্ব প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর পুরনো এবং এতে রয়েছে কোটি কোটি গ্যালাক্সি। পৃথিবী নামক এই ক্ষুদ্র গ্রহটি সেই অসীম মহাবিশ্বের একটি ধূলিকণামাত্র।
"এত বিশাল আয়োজন, এত গ্রহ-নক্ষত্র, এত বৈচিত্র্যময় প্রাণের সৃষ্টি—এর পেছনের আসল উদ্দেশ্য কী?"
ঈশ্বরকে আমি জিজ্ঞেস করতে চাই, তিনি কেন এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করলেন? মানুষ সৃষ্টির পেছনে তাঁর মূল চাওয়া কী ছিল? আমরা কি তাঁর কোনো পরীক্ষার অংশ, নাকি তাঁর কোনো অসীম আনন্দের প্রকাশ? মানুষের জীবনের কি সত্যিই কোনো মহাজাগতিক তাৎপর্য আছে, নাকি আমরা কেবলই সময়ের বিশাল ক্যানভাসে এক একটি ক্ষণস্থায়ী বুদবুদ? সৃষ্টির এই আদিম রহস্যের উত্তর মানুষের জীবনের অর্থ এবং বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যকে সম্পূর্ণ নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।
তৃতীয় প্রশ্ন: মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা (Free Will) এবং নিয়তির (Destiny) মধ্যে আসল সম্পর্ক কী?
এটি দর্শন এবং ধর্মের অন্যতম জটিল একটি বিষয়। একদিকে বলা হয়, মানুষের নিজস্ব বিচার-বুদ্ধি এবং স্বাধীন ইচ্ছা রয়েছে, যার মাধ্যমে সে তার জীবনের পথ বেছে নিতে পারে এবং সেই কর্মের জন্য সে ঈশ্বরের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। অন্যদিকে, অনেক বিশ্বাসে বলা হয় যে, অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সবকিছুই ঈশ্বরের কাছে পূর্বনির্ধারিত বা নিয়তি দ্বারা আবদ্ধ। ঈশ্বর সর্বজ্ঞ, অর্থাৎ তিনি জানেন আমি আগামীকাল কী সিদ্ধান্ত নেব।
আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করতে চাই—ঈশ্বর যদি আগে থেকেই জানেন আমি কী সিদ্ধান্ত নেব, তবে আমার স্বাধীন ইচ্ছা কি কেবলই একটি ভ্রম? নাকি নিয়তি এবং স্বাধীন ইচ্ছা এমন কোনো জটিল সমীকরণে আবদ্ধ, যা মানুষের সাধারণ বুদ্ধির অতীত? এই প্রশ্নের উত্তর মানুষের কর্ম, পাপ-পুণ্য এবং নৈতিকতার ধারণাকে একটি পরিষ্কার রূপ দিতে সাহায্য করবে।
চতুর্থ প্রশ্ন: ধর্মের নামে এত বিভেদ এবং হানাহানি কেন?
ঈশ্বর যদি এক এবং অদ্বিতীয় হন, তবে পৃথিবীতে এতগুলো ধর্মের উদ্ভব হলো কেন? আমি ঈশ্বরকে জিজ্ঞাসা করতে চাই:
কেন প্রায় প্রতিটি ধর্ম দাবি করে যে কেবল তারাই সঠিক এবং বাকিরা পথভ্রষ্ট?
আপনার নাম নিয়ে মানুষ কেন যুগে যুগে একে অপরের রক্ত ঝরায়?
আপনি কি আসলেই চান মানুষ নির্দিষ্ট কিছু আচার-অনুষ্ঠান এবং রীতিনীতির বেড়াজালে আবদ্ধ থাকুক, নাকি আপনি কেবল মানুষের হৃদয়ের পবিত্রতা এবং মানবিকতা দেখেন?
যদি সৃষ্টিকর্তা একজনই হন, তবে তিনি কেন এমন কোনো সর্বজনীন এবং অকাট্য বার্তা পাঠালেন না, যা নিয়ে মানুষের মধ্যে কোনো সন্দেহ বা বিভেদ থাকবে না? ধর্মের নামে চলা এই হাজার বছরের যুদ্ধ এবং ঘৃণার অবসান ঘটাতে এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত জরুরি।
পঞ্চম প্রশ্ন: মৃত্যু এবং পরকালের আসল রূপ কী?
মৃত্যু মানবজীবনের সবচেয়ে বড় এবং অমোঘ সত্য। কিন্তু মৃত্যুর পরের জীবন বা পরকাল নিয়ে মানুষের অজ্ঞতার কোনো শেষ নেই। কেউ বিশ্বাস করে স্বর্গে বা নরকে, কেউ বিশ্বাস করে পুনর্জন্মে, আবার কেউ মনে করে মৃত্যুর সাথে সাথেই সবকিছুর চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটে।
ঈশ্বরকে আমার শেষ প্রশ্ন হবে, মৃত্যুর ওপারে আসলে কী আছে? আমাদের চেতনা বা আত্মার কি সত্যিই মৃত্যু হয় না? আমরা কি মৃত্যুর পর আমাদের প্রিয়জনদের সাথে পুনরায় মিলিত হতে পারব? নাকি মৃত্যু মানেই সেই অনন্ত উৎসে ফিরে যাওয়া, যেখান থেকে আমরা এসেছিলাম? মৃত্যুর পেছনের এই ভয় এবং রহস্যের পর্দা উন্মোচিত হলে মানুষ হয়তো জীবনকে আরও বেশি ভালোবাসতে শিখবে এবং মৃত্যুকে শান্তিতে আলিঙ্গন করতে পারবে।
উপসংহার :
ঈশ্বরের কাছে এই প্রশ্নগুলো করার সুযোগ পাওয়া এক অসম্ভব কল্পনা হলেও, এই প্রশ্নগুলো মূলত মানুষের চিরন্তন জ্ঞানানুসন্ধানেরই প্রতিফলন। ঈশ্বর যদি আমার সামনে এসে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেনও, আমি জানি না আমার ক্ষুদ্র মানবীয় মস্তিষ্ক সেই অসীম এবং মহাজাগতিক সত্যকে ধারণ করার ক্ষমতা রাখে কি না। হয়তো তাঁর উত্তরের ভাষা আমাদের প্রচলিত ভাষার মতো হবে না।তবে একটি বিষয় আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি, প্রশ্নগুলোর উত্তর যাই হোক না কেন, জীবনের সৌন্দর্য এর রহস্যের মাঝেই লুকিয়ে আছে। যদি আমরা জীবনের সব প্রশ্নের উত্তর জেনে ফেলি, তবে বেঁচে থাকার বিস্ময় এবং রোমাঞ্চ হয়তো হারিয়ে যাবে। ঈশ্বরকে প্রশ্ন করার এই কাল্পনিক আকাঙ্ক্ষা আমাকে মূলত এটাই মনে করিয়ে দেয় যে, যতদিন আমরা এই পৃথিবীতে আছি, আমাদের উচিত সত্যের সন্ধান করা, একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং চারপাশের অসীম রহস্যকে সম্মান করতে শেখা। উত্তর না পাওয়া প্রশ্নগুলোই আমাদের বিনয়ী করে এবং প্রতিনিয়ত আরও ভালো মানুষ হওয়ার প্রেরণা জোগায়।
Leave a Comment (Text or Voice)
Comments (0)